মাহবুবা রিজভীর ছোট গল্প: বালিকা

0

নদীর মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া সহজ পথটা ছেড়ে বালিকা হঠাৎই নেমে পড়লো পাশের শাখা হয়ে বয়ে হয়ে যাওয়া ছোট সরু চিকন দুর্গম পথে। একহাত দূরের কোন কিছুও ঠিকমত বোধগম্য হচ্ছে না। ঝিঁঝি পোঁকারা কোরাস তুলেছে, দুপাশের ঝোঁপঝাড় ছোট ছোট ব্যাঙে মহা আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে বালিকার গায়ে এসে পড়ছে, বাঁশের পাতার শনশন শব্দ, দূরে কোঁথাও বুনো হিংস্র কুকুরের গগণবিদারী আতর্নাদ, মাঝে মাঝেই শরীর হিম হয়ে যাওয়া এক শীতল হাওয়া এসে আলিঙ্গন করছে, আকাশে অভিমানী মেঘ জমেছে, মেঘের চাঁদরে বারবার গাঁ ঢাকা দিচ্ছে রুপোলী চাঁদ। এমন আলো ছায়ার লুকোচুরিতে সমস্ত প্রান্তর শ্বেত রোগে আক্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। এবড়োথেবড়ো পথে কিছুটা এগিয়েই বারবার হোঁচট খেয়েই পড়ছে বালিকা। তার অবশ্য সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নাই। সে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে যাচ্ছে। কি জানি একটু দেরী হলে যদি সে চিরতরে পালায়! এই মাঝরাতে সে তার জন্যই এতোটা পথ ছুটে এসেছে। কি অদ্ভুত মুগ্ধতায় বালিকার পানে চেয়ে তাকে যেন ইশারায় কাছে ডাকলো ছায়ামূর্তিটা। ঐতো একটু দূরেই বড় বটগাছটার কোনায় তাকে দেখা যাচ্ছে। বালিকা আরও দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে। কি একটা দূর্বোধ্য নির্দয় তাড়না বোধ করে সে দিগ্বিদিকজ্ঞাণশুন্য হয়ে দিশেহারা মত ছুটতে লাগলো। হঠাৎ সে নিজেকে আবিষ্কার করলো অন্তহীন খোলা বিশাল এক মাঠের মাঝখানে। যার চারদিকে চারটি পথ বয়ে গেছে অসীমের পানে।

কিন্তু সে আর তার ছায়ামূর্তিকে দেখতে পেল না কোথাও। তাহলে কি সবটাই তার ভ্রম! বালিকা কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো, বুকের ভেতরে ক্রমাগত হাঁতুড়ি পেটানোর শব্দ, শ্বাস প্রশ্বাস ছন্দ হারিয়েছে, প্রচন্ড পানি তেষ্টায় বুকটা ফেঁটে যাবার জোগাড়, চারপাশে এখন ঝ্লমলে জোৎস্না, কোথাও একটু গা ঢাকা দেবারও উপায় নেই। পিঠের উপর সাপের ন্যায় শীতল কি একটা বয়ে গেল, হঠাৎই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথার মধ্যে কেমন এক ঝড় বয়ে গেল। বালিকা ভয়ে কুঁকড়ে উঠল। সে ফিরতে চায়! কিন্তু কোথায়! কোনপথে! কিভাবে! কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না।এরপর সে কি ভেবে হিজল গাছ বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পথটা ধরেই আগাতে লাগলো। পা দুটো প্রচন্ড ভারী লাগছে, মনে হচ্ছে পায়ের গোড়ালীতে কেউ পাথর বেঁধে দিয়েছে। চোখমেলে তাকাতে কষ্ট হচ্ছে, সবকিছু ঘোলাটে দেখাচ্ছে। হঠাৎই দূরে একটা ঘরের দেখা পেল। বালিকা প্রাণপণে ছুটে গেল সেদিকে। এই যে শ্যাওলা ধরা মাটির বারান্দা, মাদুর, একটু দূরে রাখা পিতলের কলসি সবই তার ভীষণ পরিচিত । সে একদৌড়ে এসে সেখানটায় আঁছড়ে পড়লো। সমস্ত রাত্রি এভাবেই পার হয়ে গেল। খুব ভোরে যখন তার সম্বিত ফিরে এলো, সে গতরাতে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে লাগলো। কিন্তু কোন কিছু ভেবেই সে কিনারা করতে পারলো না। তার কি হয়েছিল! সে কেন এমন করলো! তবে কি সে কারও জন্য অপেক্ষা করে, সহস্র বছরের বুভুক্ষ আত্মারা যেমন করে………….!!! এমন হাজারটা অমিমাংসিত প্রশ্ন তাকে অনবরত সুঁচ ফোঁটাতে লাগলো।।

লেখক: মাহবুবা রিজভী, ঢাকা।

Share.

Leave A Reply