ঘুরে আসুন সবুজে ঘেরা ম্যানগ্রোভ বন “সুন্দরবন”

0
মিলন কান্তি দাস : সবুজে সবুজে ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। সুন্দরী গাছ আর বাঘ-হরিণের অবাধ বিচরণের ভূমি এই সুন্দরবন। সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য দেখার জন্য রয়েছে অনেকগুলি পয়েন্ট। মোরলগঞ্জ গিয়ে জানতে পারলাম এই উপজেলার খুব কাছেই রয়েছে সুন্দরবন। তাই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে ছুটে গিয়েছিলাম বাগেরহাট জেলার মোরলগঞ্জ উপজেলার গুলিশাখালী পয়েন্টে। মোরলগঞ্জ থেকে আঠেরো কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেই পৌছে যাওয়া যাবে সুন্দরবনের গুলিশাখালী পয়েন্টে। একটি ছোট্ট খাল পেরিয়ে ওপার গিয়েই পেয়ে গেলাম সুন্দরী,গরান,গর্জন আর নাম জানা না গাছের সবুজে সবুজময় সুন্দরবনে। গুলিশাখালী পয়েন্টের ইনচার্জ সামসুল আরেফিন ভাইয়ের সাথে দেখা করে বনে প্রবেশের অনুমতিসহ ওখানকার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন কদিন আগেও কাছাকাছি বাঘ দেখাগেছে। তাই যেন বাচ্চাদের নিয়ে বেশি ভিতরের দিকে না যাই। সফরের অন্যান্য সাথীদের নিয়ে ভেতরের যেতে যেতে ছবি তোলার উৎসব চলতে থাকে। আমাদের গাড়ির দুই ড্রাইভার সবুজ আর রাসেল আমাদের পথ দেখিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যায় আবার গ্রুপ ছবি তুলতে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। আমরা বিকেলে সুন্দরবনে গিয়েছিলাম বলে ওরাও বেশি ভেতরের দিকে না যেতে পরামর্শ দিলো। তারপরও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য কেউ লোভ সামলাতে পারছিলাম না। চোখ জুড়ানো সবুজের সমাহার কেবল হাতছানি দিচ্ছিলো। আবার বাঘে ধরার ভয়ও মনের মধ্যে উকিঝুকি মেরে পেছনের দিকে টানছিলো। একদিকে ভয় আর একদিকে সবুজের হাতছানি সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিলো। ওখানে
দেখা হলো গৌতম কর্মকার নামে এক পর্যটকের সাথে তিনি জানালেন মোরলগঞ্জ রাজাপুর নামক আরেকটি পয়েন্ট আছে সেখানে পশুর নদীর একটা অংশ আছে। তিনি একবার সেই পয়েন্টে সবার সাথে ঘুরে গিয়েছিলেন। পশুর নদীর ওই এলাকাটি একটা খালের মতো হয়ে গেছে তাই সবাই হেটেই ওপারে যাচ্ছিল। হঠাৎই খবর হলো নদীতে বাণ ডেকেছে। তিনি দেখছেন নদীর জল তার দিকে এগিয়ে আসতেছে। দেখতে দেখতে পাড় হচ্ছিলেন কিন্তু পাড় হওয়ার আগেই তিনি কাদার মধ্যে আটকে যাচ্ছিলেন। সাথের কেউ এগিয়ে না এসে দুরে বসে চিৎকার চেঁচামেচি করছিলেন। তখন স্থানীয় লোকজন দড়ি বা কাপড় ছুড়ে মারতে বলতে ছিলেন। ওদিকে জল ছুটে আসছে আবার মাটিতে আটকে যাচ্ছে তখন তাকে মৃত্যুর চিন্তা আচ্ছন্ন করছিলো। দুই হাত আর কনুই দিয়ে চেষ্টার ফলে হঠাৎই উপরে উঠে যাই। বাণ ডাকা যে কতোই ভয়ানক তা সেদিন বাস্তবে দেখেছিলেন গৌতম কর্মকার। ওখানেই দেখা হয় কলেজ শিক্ষক পলাশ সাহার মায়ের সাথে তিনি বলেন জন্ম বেড়ে ওঠা এবং নাতি-নাতিনি হলেও এই প্রথম এসেছিলেন সুন্দরবন দেখতে। কেমন লেগেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন বাড়ির কাছে এতো সুন্দর জায়গা আছে বুঝতেই পারিনি। আজ এই সৌন্দর্য দেখে মনপ্রাণ ভরে গেছে।
ঘোরাঘুরির করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা নেমেছে টেরই পেলাম না। পরে সবাই ওয়াজ টাওয়ারে উঠে কিছুটা সময় সবুজ সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। বাচ্চাদের আনন্দের সীমাপরিসিমা ছিল না। হঠাৎই বাচ্চাদের চিৎকার বাঘ বাঘ বলে। ছুটে গেলাম সেদিকটাতে কোথাও কিছু নেই। কিন্তু বাচ্চাদের দাবী তারা হলুদ ডোরাকাটা কিছু একটা দেখেছে যা না কি জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। ওদের কথা মেনে নিতে হলো বাঘ না হলেও বাঘের মতো কিছু একটা দেখেছে। ফিরে এসে গাড়িতে উঠেছে সবাই ঠিক এই সময়ে গুলিশাখালী পয়েন্টের ইনচার্জ আরেফিন এসে বললেন আপনারা বের হওয়ার পরপরই দুটো হরিণ এসে পুকুরে জল খেতে নেমেছে। এই কথা শুনে আবার দৌড়ে ছুটে গেলাম পুকুরের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে হরিণ ফিরে গেছে গভীর জঙ্গলের ভিতর। নিরাশ হয়ে ফিরে এলাম গাড়ির দিকে। একটি বিকেলে সবুজের অপরূপ সৌন্দর্য হৃদয়ে ধারন করে ফিরে এলাম কোলাহল পূর্ণ শহরে। আপনিও যদি সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান তবে ছুটে যেতে পারেন সুন্দরবনের যে কোন একটি পয়েন্টে। আমার বিশ্বাস আপনি প্রকৃতিপ্রেমিক হলে আপনার হৃদয়ে প্রশান্তির ছোঁয়া লাগবে।
লেখার বাইরে সুন্দরবন সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে চাই ।
সুন্দরবন’র সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি। কারো কারো মতে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়েছে। কারণ এই বণে  প্রচুর সুন্দরী গাছ জন্মায়। আবার এরকম শোনাগেছে “সমুদ্র বন” বা “চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)” (প্রাচীন আদিবাসীদের) নাম থেকে এই বনের নামকরণ করা হয়েছে । আমার মতে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবন’র নামকরণ হয়ে থাকতে পারে।
এই বন বঙ্গোপসাগর উপকূলের একটি প্রশস্ত বন। এই বইটি বিশ্বের অন্যতম একটি সৌন্দর্য মন্দির এলাকা। এই বুকে বেষ্টন করে আছে গঙ্গা,মেঘনা আর ব্রহ্মপুত্র নদী তিনটিকে ঘিরে একটি বদ্বীপে পরিণত হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ও উত্তর চব্বিশ পরগনা আর বাংলাদেশের বাগেরহাট, খুলনা,সাতক্ষিরা জেলা জুড়ে আছে। সমুদ্র তীরে নোনা জলে পৃথিবীর সব থেকে বড়ো ম্যানগ্রোভ বনভূমি এই সুন্দরবন। দশ হাজার বর্গকিলোমিটার সুন্দরবনের ছয় হাজার সতেরো বর্গকিলোমিটার বনভূমির মালিক আমরা বাকীটা ভারতের।
১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কোর কাছ থেকে বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত অর্জন করে সুন্দরবন। এই বনের আঠেরোশ চুয়াত্তর বর্গকিলোমিটার জলে বেস্টিত। এই বনে আবাস আছে ১০৬টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, দের লক্ষর মতো চিত্রাহরিণ, কুমির,সাপসহ নানান ধরনের পাখি। ধারনা করা হয় মুঘল আমলে(১২০৩ – ১৫৩৮) খ্রিষ্টাব্দের দিকে স্থানীয় এক রাজা সুন্দরবন লিজ গ্রহন করেন। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর’র কাছ থেকে স্বত্বাধিকার লাভ করার পর সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরি করা হয়। ১৮৬০ সালে তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের এই বনটি একটি কাঠামোর মধ্যে চলে আসে। ১৮২৮ সালে ইংরেজ সরকার সুন্দরবনের অধিকার অর্জন করে। ১৮২৯ সালে এলটি হযেজ প্রথম এই বনের জরিপ করেন। ১৮৭৮ সালে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড ম্যানগ্রোভ বনভূমিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতা দিলে ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশের মধ্যে পড়ে। বন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে এর সদর দপ্তর করা হয় খুলনাতে। এই সুন্দরবন দেখতে এখন প্রকৃতিপ্রেমিক লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে আসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে। এই অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র আমাদের গর্ব আর গৌরবের। আপনিও সময় আর সুযোগ পেলে ঘুরে আসুন ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন।
Share.

Leave A Reply